গিগ অর্থনীতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

গিগ অর্থনীতির ক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ই-কমার্স, অনলাইন মার্কেটপ্লেস, রাইড শেয়ারিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এন্ড্রওয়েড/ অ্যাপেল অ্যাপভিত্তিক নানা কাজে যুক্ত হচ্ছেন দেশের তরুণেরা। দক্ষিণ এশিয়ায় গিগ অর্থনীতির দিক থেকে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

‘গিগ ইকোনমি’ হচ্ছে এমন একটা পরিবেশ, যেখানে অস্থায়ী চাকরির ছড়াছড়ি থাকবে আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে স্বতন্ত্র কর্মীদের (ইন্ডিপেন্ডেন্ট ওয়ার্কার্স) নিয়োগ দেবে। তারা ফুল টাইম কর্মীদের চেয়ে ফ্রিল্যান্সারদের গুরুত্ব বেশি দেবে এবং বেশির ভাগ কাজ এই ফ্রিল্যান্সারদের দিয়েই করাবে। মজার ব্যাপার হলো, এই গিগ ইকোনমিই কিন্তু হবে শহুরে অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি।

উন্নত বিশ্বে এই ধারা ইতিমধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং ধারণা করা যাচ্ছে, ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ৪০ ভাগ আমেরিকান চাকরির এই ধারা দ্বারা প্রভাবিত হবেন, যা আস্তে আস্তে পুরো বিশ্বে ছড়াবে এমনটাই ধারনা করছেন অর্থনৈতিক বোদ্ধারা। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে সাড়ে ছয় লাখ বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সার কাজ করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান এডিসন রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৪ সালের তুলনায় বর্তমানে ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা ৩০০ গুণ বেড়েছে। প্রায় ৬ কোটি আমেরিকান বর্তমানে ফ্রিল্যান্সের সঙ্গে যুক্ত। এটা ধারণা করা হচ্ছে যে ২০২৭ সালের মধ্যে আমেরিকার বেশির ভাগ কর্মীই ফ্রিল্যান্সের সঙ্গে যুক্ত হবেন।

ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম আপওয়ার্ক ও ফ্রিল্যান্সার্স ইউনিয়নের সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মোট শ্রমশক্তির চেয়ে তিন গুণ দ্রুত বাড়ছে ফ্রিল্যান্সিং শ্রমশক্তি। এ ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি ব্লক চেইন, বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ফ্রিল্যান্সিং কর্মী নিয়োগের ইচ্ছা বড় ভূমিকা রাখবে।

গিগ অর্থনীতির বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট
বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারের বড় একটি গন্তব্য বাংলাদেশ। এ খাতের কর্মী সরবরাহে বাংলাদেশ ১৬ শতাংশ বাজার দখল করে আছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখানে মাসে ৬০ মার্কিন ডলার মতো মাসিক আয়। সেখানে গিগ অর্থনীতি বা আউটসোর্সিং আর্থিক স্বাধীনতা ও আয় বাড়ানোর জন্য বড় সুযোগ। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী সে সুযোগ নিচ্ছে।

গিগ অর্থনীতি বা ফ্রিল্যান্সিং কাজের সুযোগ খুঁজে দেয় বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান সেবা এক্সওয়াইজেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা ঈশা আবরার বলেন, কয়েক বছর ধরে ফ্রিল্যান্সিং কাজে আগ্রহ বাড়তে দেখা গেছে। তাঁদের সাইটে এ ধরনের কাজের ব্যবহারকারীর বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে। যাঁরা এ ধরনের কাজের জন্য একা বা কয়েকজন মিলে উদ্যোগ নেন, তাঁদের বলে উদ্যোক্তা। ২০১৬ সালে তাঁদের সাইটে ছিলেন ১৪২ জন উদ্যোক্তা। ২০১৭ সালে তা ১ হাজার ৫০৮ জন, যা ২০১৮ সালে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজারে। ভালো উদ্যোক্তারা মাসে ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা আয় করছেন।

‘অনলাইন লেবার ইনডেক্স ওয়ার্কার সাপ্লিমেন্ট’–এর তথ্য অনুযায়ী, গিগ অর্থনীতিতে পাকিস্তানের চেয়ে দ্বিগুণ ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। গ্লোবাল গিগ অর্থনীতির ৮ শতাংশ পাকিস্তানের।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীরের ভাষ্য, বিশ্বে আউটসোর্সিং তালিকায় কর্মী সরবরাহে বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে। এখানে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচ লাখ কাজ করেন মাসিক আয়ের ভিত্তিতে। বিশাল এ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ তরুণ। তাঁরা চাকরির বদলে ফ্রিল্যান্সিংকেই পেশা হিসেবে নিয়েছেন। বাংলাদেশে ১৬ শতাংশ তরুণের মধ্যে এখন ঘরে বসে ইন্টারনেটে আয় বা অনলাইনে কাজ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। চাকরির চেয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিয়ে অনেকেই এখন ঝুঁকছেন ফ্রিল্যান্সিংয়ে।

ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ২ লাখের বেশি ফ্রিল্যান্সার কাজ করছেন। ২০২০ সাল নাগাদ ফ্রিল্যান্সারদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ২০ কোটিতে। কাজের সুবিধার কথা মাথায় রেখে প্রচলিত কাজ ছেড়ে অনেকেই ফ্রিল্যান্সিংয়ে ঢুকছেন। ফ্রিল্যান্সিংয়ের বাজারে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করেছে। মার্কেটপ্লেসগুলোতে দক্ষ ফ্রিল্যান্সারদের চাহিদা বেশি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

ফ্রিল্যান্সিং খাতে আরও এগিয়ে যেতে দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দেন তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর আমরা এখন ৩০ হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। আগামী ২০২১ সালে আমরা এক লাখ তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার টার্গেট নিয়েছি। প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর এই তরুণেরা জনশক্তিতে পরিণত হবেন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *